• রংপুর
  • শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১

ঘুষখোর এক সরকারি চাকরিজীবীর কেচ্ছা!

এম সুজন আকন
আজকের সমাজ

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২০

আমার বাবা একজন সরকারি কর্মচারী ছিলেন। খুব ছোট একটা পদে দীর্ঘদিন চাকরি শেষে গত বছর অবসরে গিয়েছেন। তিনি সহজ সরল এবং মানুষ ঠকান না এটাই আমার কাছে গর্বের বিষয়।

বছর দুই আগে আমি ঢাকা থেকে গ্রামে গিয়েছিলাম ছুটিতে। এসময় বাবার এক পুরনো সহকর্মী আমাদের বাড়িতে ঘুরতে এসেছেন। আমাদের ঘরে তিনি প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই আমি তাকে সালাম দিলাম, ঠিক ঠাক আপ্পায়নও করলাম।

এরপরে যখন সবাই গল্প করছেন, ওই সময় বাবাকে তিনি বললেন ‘কিরে ভাই এখন পর্যন্ত একটা বিল্ডিংয়ের বাড়ি তৈরি করতে পারোনি? এত বছর চাকরি করে কিছু টাকা দিয়ে ছেলেকে একটা সরকারি চাকরিও দিতে পারলি না? সারাজীবন চাকরি করে কি করলি?’

বাবার সেই সহকর্মীর কথাগুলো শুনে আমার মেজাজ খুব খারাপ হলো। বাবা কিছু বলার আগেই আমি বললাম ‘আঙ্কেল বাবা আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবেন তবে তার আগে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর আপনি দেন।’

বাবার সারাজীবনের সব বেতনের টাকা জমিয়েও কি আপনি যে বাড়িটা করেছেন সেটা করা সম্ভব? বাবা যে বেতন পান তা থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা জমিয়ে ছেলের জন্য ঘুষ দিয়ে সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন? আপনি আর বাবাতো একই পদে চাকরি করছেন, অথচ আপনি এত কিছু করে ফেললেন কিন্তু বাবা কিছুই করতে পারেনি এর অর্থ দাঁড়ায় আপনাকে সরকার বাবার থেকে বেশি বেতন দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে কি সেটা সম্ভব?

তখন আমার মনে আরো কিছু প্রশ্ন ছিলো, কিন্তু তিনি আর সেগুলো করার সময় দিলেন না। নির্লজ্জ সেই হাহাহা করে অট্টহাসি দিয়ে বললো ‘আমাদের সেই ছোট ভাইচতা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, কথায় পারবো না’।

আমি জানি তিনি শেষ কথাটা মন থেকে বলেনি। নিজের পঁচা দুর্গন্ধযুক্ত চেহারাটা বেড়িয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই অট্টহাসির মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ফেলেছেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম সেদিন আঙ্কেল প্রচুর লজ্জা পেয়েছেন।

আমার বাবা তিন দশকেরও বেশি সময় চাকরি করে আজ পর্যন্ত বিল্ডিংয়ের বাড়ি বানাতে পারেননি এটা ঠিক, কিন্তু তার সন্তানদের চোখে ঘুষখোর বাবা হননি। ঘুষ দিয়ে সরকারি চাকরি দিতে পারেননি ঠিকই কিন্তু সৎ পথে রোজগার করে পেট চালানোর শিক্ষা দিয়েছেন। সারাজীবন চাকরি করে বিপুল অর্থ তিনি রোজগার করতে পারেননি ঠিকই কিন্তু অসৎ টাকার অহংকারে মেতে ওঠেননি।

আমাদের গ্রামে বাবাকে দেখলে কেউ বলে না, ‘সারাজীবন চাকরি করে লোকটা বিল্ডিংয়ের বাড়ি করতে পারেনি।’ অথচ সেইসব আঙ্কেলদের কিন্তু ঠিকই মানুষ পেছনে বলে বেড়ান, ‘এই লোকটার বিল্ডিংয়ের বাড়িটা ঘুষের টাকায় তৈরি।’

লেখক- এম সুজন আকন, সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© All rights reserved © 2020
Desing & Developed by Moksadul Momin