• রংপুর
  • শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১

মায়ের পরকীয়ায় বাঁধা দেয়ায় ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করা হয় ছেলেকে

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
Area

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২০

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের মরিচারচর নামাপাড়া এলাকায় স্কুল ছাত্র পারভেজ হত্যার রহস্য উৎঘাটন করেছে র‌্যাব ও পিবিআই। ঘটনার সাথে জড়িতের অভিযোগে মূল পরিকল্পনাকারী পারভেজের মাসহ ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিঞ্জাসাবাদে হত্যার কথা স্বীকার করেছে তারা। মায়ের পরকীয়া দেখে ফেলায় হত্যা করা হয় ছেলেকে। বৃহস্পতিবার বিকালে গ্রেপ্তারকৃত আসামি রবিকে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্র্যাট আদালতে হাজির করা হলে সে ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয় বলে জানায় পিবিআই।
বৃহস্পতিবার বিকালে র‌্যাব-১৪ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের উপ-অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি
জানান, ১১ অক্টোবর ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে মালয়েশিয়া প্রবাসী মঞ্জুরুল হকের ছেলে পারভেজের (১৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরদিন নিহত পারভেজের চাচা বাদী হয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব-১৪ অপারেশনটিম গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১৪ অক্টোবর (বুধবার) রাতে ঈশ্বরগঞ্জ থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযিান চালিয়ে মামলার প্রধান আসামি মরিচারচর পূর্বপাড়ার এমদাদুল হক (৩৮), নিহত পারভেজের মা রোজিনা আক্তার (৩০), মরিচারচার উত্তরপাড়ার আবদুল গনি (৪৫), পূর্বপাড়ার সুলতান উদ্দিন (৪০) ও রুহুল আমিনকে (৫৮) গ্রেপ্তার করা হয়।
র‌্যাব উপ-অধিনায়ক আরো জানান, নিহত পারভেজের মা রোজিনা আক্তারের সাথে এমদাদুল হকের সাথে দীর্ঘদিন ধরে পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল। সম্প্রতি তাদের অবৈধ সম্পর্কে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ছেলে পারভেজ। ঘটনাটি রোজিনার প্রবাসী স্বামীর কাছে বলে দেয়ার ভয়ে পারভেজকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে মা রোজিনা। পরিকল্পনা মোতাবেক ১১ অক্টোবর রাতে অর্থের বিনিময়ে খুনি ভাড়া করে বাড়ি থেকে ফোনে ডেকে নিয়ে হত্যা করে পারভেজকে। পরে মরদেহ ফেলে দেয়া ব্রহ্মপুত্র নদে। উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পারভেজ (১৫) নামে এক স্কুল ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পিবিআই ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, পারভেজ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি রবিউল ইসলাম রবি (১৮) নামে অপর এক আসামীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ময়মনসিংহ। গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকা থেকে বুধবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় পারভেজের ব্যবহৃত সীমসহ একটি স্মার্ট ফোন এবং তার মায়ের ব্যবহৃত সীমসহ একটি বাটন ফোন। বৃহস্পতিবার বিকালে গ্রেপ্তারকৃত রবিকে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্র্যাট আদালতে হাজির করা হলে সে ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।
মা রোজিনার পরকীয়া প্রেমের পথে বাঁধা হওয়ায় সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে পারভেজকে।
পারভেজের বাবা মুঞ্জুরুল হক একজন মালয়েশিয়া প্রবাসী। পাঁচ সন্তানকে নিয়ে স্বামীর বাড়ীতে থাকে স্ত্রী রোজিনা। পারভেজ ছিল তাদের বড় সন্তান। সে মরিচার চর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণির ছাত্র। পারভেজের বাবা দীর্ঘ দিন প্রবাসে থাকায় পারভেজের মা রোজিনা জড়িয়ে পড়েন একাধিক পরকীয়া প্রেমে। রোজিনা দিনে রাত কথা বলত তার প্রেমিকদের সাথে। পারভেজ বিষয়টি আঁচ করতে পেরে নানাভাবে তার মাকে বাঁধা দিত। তার মা যে নম্বরগুলোতে কথা বলতো পারভেজ কৌশলে সেই নম্বরগুলো ব্লক লিস্টে রেখে দিত। 
আসামী রবিউলের বাড়ী পারভেজের বাড়ীর কাছে হওয়ায় পারভেজের মা রোজিনা তার ফোনের ব্লক করা নম্বরগুলো রবিউলের কাছ থেকে আনব্লক করে নিত। রুজিনা ফোনে কথা বলার জন্য মোবাইলে টাকা রিচার্জ করে নিত আসামি রবিউলের মাধ্যমে। 
পারভেজ দিন দিন আরো জোরালোভাবে তার মায়ের পরকীয়া প্রেমে বাঁধা দিতে থাকে। তার মাকে ভয় দেখায় সব ঘটনা সে তার বাবাকে বলে দেবে। ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে পারভেজের মা। পরিকল্পনা করতে থাকে নিজ সন্তানকে হত্যা করে পথের কাটা দূর করার। এ দিকে গত কোরবানীর ঈদের পর হতে আসামি রবিউল ইসলাম রবি টঙ্গীতে গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরী নেয়। ছেলেকে হত্যা করে পথের কাটা দূর করার পরিকল্পনা মোতাবেক গত ৯ অক্টোবর পারভেজের মা রোজিনা ফোন করে রবিউলকে জরুরী কথা আছে বলে টঙ্গী থেকে বাড়িতে আনে।
তখন রোজিনা ছেলে পারভেজকে খুন করার প্রস্তাব দেয় রবিউলকে। বিনিময়ে অফার দেয়া হয় ৫০ হাজার টাকা। লোভে পড়ে যায় রবিউল। অনেক চিন্তার পর রাজি হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে কিভাবে? তখন পারভেজের মা বলে তুমি নদীর পাড়ে গিয়ে অপেক্ষা কর, আমি পারভেজকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তখন আসামি রবিউল নদীর পাড়ে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সে নদীর পাড়ে থাকা একটি গাছের মোটা ডাল তার কাছে রাখে। এদিকে রুজিনা তার ফোনটা পারভেজের হাতে দিয়ে বলে নদীর পাড়ে রবিউল আছে তুমি গিয়ে এই ফোনটা তাকে দিয়ে আস। পারভেজ তার সাইকেল নিয়ে নদীর পাড়ের উদ্দেশ্যে বের হয়। মায়ের কথায় সরল বিশ্বাসে মুত্যুর দিকে এগোতে থাকে পারভেজ। পারভেজ নদীর কিনারায় পৌছে রবিউলকে দেখতে পায় এবং তার মায়ের দেয়া ফোনটা রবিউলকে দিয়ে দেয়। ফোন রবিউলের হাতে দিয়ে পারভেজ বাড়ীর দিকে পা বাড়নোর সঙ্গে সঙ্গে রবিউল তার কাছে রাখা গাছের মোটা ডাল দিয়ে পারভেজের মাথায় স্বজোরে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। আকস্মিক আঘাতে হতবিহবল পারভেজ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আসামি রবিউল পারভেজের স্মার্ট ফোন এবং পারভেজের মায়ের দেয়া বাটন ফোন ২ টি নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। রবিউল পারভেজের মা’র কাছে এসে হত্যার ৫০ হাজার টাকা দাবী করেন। তখন পারভেজের মা তাকে বলে এখন তুমি যাও। পারভেজের বাবা বিদেশ থেকে টাকা পাঠালে আমি তোমাকে ডেকে দিয়ে দিব”। এরপর আসামি রবিউল ঐ রাতেই আবারও টঙ্গীতে ফিরে আত্মগোপন করে। পরদিন সকালে একই গ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পারভেজের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ই-মেইল : news.ajkersamaj@gmail.com
এ জাতীয় আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2020
Desing & Developed by Moksadul Momin