• রংপুর
  • বুধবার, ১২ মে, ২০২১

রূপকল্পের টেলিযোগাযোগ ও সাফল্য

সেলিম রেজা

প্রকাশ : রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার উপস্থাপন ‘রূপকল্প ২০২১’-এর অর্জন নিয়ে যদি কেউ গবেষণা করতে বসেন তাহলে প্রথমেই চোখে পড়বে অন্যান্য সাফল্যের পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশের দৃশ্যমান অগ্রগতি যা সাধিত হয়েছে প্রধানত, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে। এই খাতের বর্তমান নেতৃত্ব মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ও সাবেক নেতৃত্ব প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের হাতে অনেক অর্জন ঘটেছে ও অনেক কাজ চলমান আছে যেগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া উচিত। যে কেউ আমার সঙ্গে একমত হবেন, এক যুগ আগে সেই ১২ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা যখন তাঁর দলের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন তখন সে ইশতেহারের সঙ্গে যুক্ত ছিল উন্নয়নের একটি রূপকল্প ও রূপরেখা যা ‘দিন-বদলের সনদ’ নামে বিশেষ পরিচিত; সেই দিন-বদলের সনদে ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এখন বাস্তব ও অন্যান্য দেশে অনুকরণীয় হয়েছে।

আমরা জানি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ সংগঠনে তথ্য-প্রযুক্তির একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে কিন্তু তার আগে যে অনিবার্য অবকাঠামো বিন্যস্ত হওয়া দরকার দীর্ঘদিন তা ছিল এলোমেলো ও অসংগঠিত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোন প্রস্তুতি ছাড়াই আমরা বিশ্বভুবনের উচ্চগতির ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হই ২০০৬ সালের ২০ মে। এর আগে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত হবার অনেক আহ্বান আমরা না বুঝেই প্রত্যাখ্যান করেছিলাম তা এখন আলোচনা করে লাভ নেই। এ কথাও সত্য যে, বাংলাদেশে প্রথম ভিস্যাটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সূচনা হয় ১৯৯৬ সালের জুন মাসে। তখন প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেটের জন্য খরচ হতো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা যা বর্তমান সরকারের আমলে এসে অবিশ্বাস্যভাবে পৌঁছেছে মাত্র ৩০০ টাকায়। ১৯৯৬ সালেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রথমবার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের একচেটিয়া ব্যবসা যা ‘সিটিসেল’ করছিল সে মনোপলি ভেঙ্গে দিয়ে ‘গ্রামীণ ফোন’, ‘একটেল’ এবং ‘সেবা’ নামের তিনটি জিএসএম ঘরনার মোবাইল ফোন লাইসেন্স দেয় যে কারণে দ্রুত টেলিযোগাযোগ সেবা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে। এই মোবাইল ফোনগুলো ইন্টারনেট সেবা বিস্তৃত করতে একটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল যদিও তার ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য কতটা অর্জিত হয়েছে তা আলাদা আলোচনার বিষয়।

২০০৯ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন দর্শনের মৌলিক অনুষঙ্গ হিসেবে ‘সকলের কাছে প্রযুক্তির সেবা’ পৌঁছে দেবার প্রয়াস নিয়েই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ সংগঠনের শর্তগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অন্যতম টেলিযোগাযোগ সেবা গত এক দশকে দেশব্যাপী ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। আমরা অনেকেই বুঝতে ভুল করি যে টেলিযোগাযোগ সেবা মানেই বুঝি ফোনের সেবা যা সরকারী প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল দেয়। এই অনিবার্য ও গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন সেবা ছাড়াও টেলিযোগাযোগের আরও কতগুলো জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ খাত ও অঙ্গ সংস্থা রয়েছে তার মধ্যে ‘ডাক বিভাগ’ একটি অন্যতম। এছাড়া রয়েছে, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন’ যারা মোবাইল টেলিফোনের ও ইন্টারনেটের সেবার মান ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, ‘ডাক অধিদফতর’ যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চিঠি-পত্র লেনদেন ও সঞ্চয় হিসাবের জন্য আমরা সবাই পরিচিত, ‘বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড’ যারা দেশব্যাপী টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা দেয়, ‘টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড’ যারা সাশ্রয়ী মূল্যে মোবাইল ফোনের সেবা দেয়, ‘টেলিফোন শিল্প সংস্থা লিমিটেড’ যারা টেলি-যোগাযোগের যন্ত্রপাতি, ফোন সেট ইত্যাদি উৎপাদন বা সংযোজন করে, আছে ‘বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেড’ যে প্রতিষ্ঠান টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবার জন্য কেবল উৎপাদন করে, ‘মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ’ যারা বেসরকারী কুরিয়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ করে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ইন্টারনেট সেবা নিতে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড’, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ও মহাকাশের সকল যোগাযোগ সমন্বয়ের জন্য ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ ও সর্বোপরি সকল ক্ষেত্রে তদারকির জন্য ‘টেলিযোগাযোগ অধিদফতর’।

একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে ব্যাপক জনশক্তি যারা উচ্চ পর্যায়ের অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ এমনকি সর্বনিম্ন পর্যায়েও রয়েছে দরিদ্র-নিম্নবিত্ত পরিবারের বহু মানুষ, তাদের কেউ কেউ নিয়মিত আবার কেউ কেউ খ-কালীন চাকরিরত। কিন্তু সকলের লক্ষ্যই একটি, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়ন করা। দেখা যায়, টেলিযোগাযোগের প্রতিটি অঙ্গ সংস্থা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাজার তৈরি করেছে যা অর্থনৈতিক হিসেবে জিডিপিতে যোগ করছে প্রায় ৭/৮ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থানের দিক থেকে এই খাত কৃষি খাতের পরেই উৎপাদনশীল জনশক্তির বাজারে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে। শুধু টেলিযোগাযোগ সেবা নয়, এর প্রভাবের বাজার নিয়েও আমাদের ভাবা দরকার। আমরা নিত্যদিনের কাজে এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির সেবা ছাড়া আগাতেই পারি না। স্বাস্থ্য সেবা এখন এই ডিজিটাল প্রযুক্তির দখলে প্রায় চলেই যাচ্ছে; শিক্ষা, দেশে-বিদেশে আন্তঃযোগাযোগ, মেধাবৃত্তির টাকা বা হতদরিদ্রের জন্য সরকারী প্রণোদনা, সাহায্য, এমনকি শিক্ষক ও প্রান্তিক জনপদের কর্মীদের বেতনের টাকা পাঠাবার জন্য এখন ভাবা হচ্ছে ডিজিটাল সেবা কেমন করে উপযুক্ত মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আগ্রহে ও দিক-নির্দেশনায় ডাক বিভাগের জন্যও ভিশন তৈরি করে কার্যক্রমে একটি গতিশীলতা আনা হয়েছে, বলা হয়েছে, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বল্প সময়ে এবং স্বল্প খরচে জনগণের দোরগোড়ায় ডাক সুবিধা পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং সততা, বিশ্বস্ততা ও জনসেবার ব্রত নিয়ে ভৌত, আর্থিক, ইলেক্ট্রোনিক্সসহ সব ধরনের মানসম্মত সার্ভিস প্রদান করার মাধ্যমে বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে বিশ্বমানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা।’ আমরা অনেকেই জানি ইতোমধ্যে ডাক বিভাগ ‘নগদ’ নামে একটি বিশেষ লেনদেন ব্যবস্থা চালু করেছে যা দেশব্যাপী বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সকল স্বপ্ন-দর্শনই বাস্তবরূপ নিতে সক্ষম যদি কার্যক্ষেত্রে উপযুক্ত নেতৃত্ব থাকে। বর্তমান ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ডিজিটাল প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও জনপ্রিয়করণে একজন পরীক্ষিত গবেষক যিনি বাংলা ভাষাকে কম্পিউটারে স্থান দিতে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন। আজ থেকে প্রায় তিন যুগ আগে তিনি কম্পিউটারে বাংলা হরফ সংযোজন নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার উদ্ভাবনে ছাপাখানায় বাংলাদেশে কম্পিউটার প্রযুক্তি স্থান পেয়ে অফসেট প্রিন্টিং-এ ব্যাপক সাশ্রয়ী রূপান্তর ঘটে। গ্রামে-গঞ্জে মাল্টিমিডিয়া স্কুল স্থাপন করে ব্যবহারিক শিক্ষা প্রসারিত করে প্রযুক্তি নির্ভর কর্মমুখী জনশক্তি তৈরি করতে মোস্তাফা জব্বার যে ভূমিকা পালন করেন তার সাফল্য ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ দেখতে পাচ্ছে। এরকম একজন কর্মোদ্যোগী নেতৃত্ব বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সফল হবেন আমরা সে প্রত্যাশা তাঁর কাছে করি।

টেলিযোগাযোগ বিভাগের সব অঙ্গ সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টায় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ তার সফল গন্তব্যে পৌঁছাবে এতে সন্দেহ নেই কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে এই খাত ক্রম-বিবর্তনের মধ্য দিয়েই যুগ যুগ ধরে এগিয়েছে ও সামনের দিনে আরও রূপান্তরিত হবে। সে রূপান্তর-পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েই বাংলাদেশের মানুষকে এই খাতের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে হবে। জীবিকা নির্বাহে সাধারণ পরিবারের লাখ লাখ মানুষ এই খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমরা যেন প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না বলে তাঁদের অবহেলা না করি। সে জনশক্তিকে প্রস্তুত করা, গড়ে তোলাও এই খাতের জন্য অন্যতম শর্ত হওয়া দরকার। ‘ক্লাউড হোস্টিং’ বা ‘স্যাটেলাইট’ নিয়ন্ত্রণ যেমন জরুরী তেমনই চিঠি পৌঁছে দেয়া, নিশ্চিত করে কারও বাড়িতে নগদ টাকা পৌঁছে দেয়া কোনটাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই খাতের সঙ্গে তাই যেমন জড়িয়ে আছে উন্নত মেধাশক্তি তেমনই সাধারণের শ্রমশক্তিও, ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য এই দুই শক্তির ইতিবাচক সংমিশ্রণ অনস্বীকার্য।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম গবেষণা প্রকল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© All rights reserved © 2020
Desing & Developed by Moksadul Momin